নিজের নামটুকু ছাড়া আর কোনো অক্ষরজ্ঞান নেই চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের বাসিন্দা মো. মোবারকের। একসময় জীবিকার তাগিদে কাজ করতেন সাধারণ একজন রংমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে। কিন্তু সেই সাধারণ পেশা ছেড়ে এক দশকের ব্যবধানে তিনি হয়ে ওঠেন চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক ত্রাস, যার পরিচিতি ছড়ায় ‘গলাকাটা মোবারক’ নামে। দুই হাতে সমানতালে পিস্তল চালানো এবং বুকে সাব-মেশিনগান (এসএমজি) জড়িয়ে ঘুমানো এই দুর্ধর্ষ অপরাধীকে সম্প্রতি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তার গ্রেপ্তারের পর পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে রংমিস্ত্রির সহকারী থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও শুটার হয়ে ওঠার এক রোমহর্ষক ও চাঞ্চল্যকর কাহিনী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ফটিকছড়িতে বাবু নামের এক ব্যক্তিকে গলা কেটে হত্যা করার অভিযোগ ওঠার পর অপরাধজগতে মোবারকের অভিষেক ঘটে এবং তিনি ‘গলাকাটা মোবারক’ নাম পান। শুরুতে শিবির ক্যাডার নাছির উদ্দিনের হাত ধরে অপরাধে জড়ালেও, পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে তিনি রূপ বদল করেন। উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তৈয়বের প্রশ্রয়ে তিনি এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল ও অস্ত্রবাজি নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মোবারক যোগ দেন বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘বড় সাজ্জাদ’ বা সাজ্জাদ আলীর অন্যতম সহযোগী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের গ্যাংয়ে। অল্প দিনেই ইমন বাহিনীর ‘সেকেন্ড-ইন-কমান্ড’ এবং প্রধান শুটার হিসেবে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন মোবারক।
মোবারকের অপরাধের ধরন ও অস্ত্রপ্রীতি ছিল সিনেমার গল্পের মতো। তিনি দুই হাতে দুটি পিস্তল নিয়ে একসঙ্গে নিখুঁতভাবে গুলি চালাতে পারতেন, যা তিনি তার গুরু ইমনের কাছ থেকে রপ্ত করেছিলেন। অস্ত্র চালানোকে তিনি নিজের ‘শখ’ বলে দাবি করেন। শুধু তাই নয়, নিজের নিরাপত্তা ও ক্ষমতার দাপট দেখাতে তিনি সবসময় সঙ্গে সাব-মেশিনগান (এসএমজি) রাখতেন এবং রাতে ঘুমানোর সময়ও সেটি বুকে জড়িয়ে ঘুমাতেন। ৫ আগস্ট কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া ব্রাজিলের তৈরি একটি অত্যাধুনিক পিস্তলও ছিল তার সংগ্রহে, যা দিয়ে গ্রেপ্তারের সময় তিনি পুলিশকে লক্ষ্য করে ৬ রাউন্ড গুলি ছোড়েন।
শহরে বা লোকালয়ে কোনো অপরাধ বা খুনের মিশন শেষ করেই মোবারক ফটিকছড়ি ও রাউজানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করতেন। পুলিশ জানিয়েছে, মোবারকের প্রথম স্ত্রী ডলি চাকমা জাতিগতভাবে পাহাড়ি হওয়ায়, তার মাধ্যমে পাহাড়ের একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের সঙ্গে মোবারকের গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সহায়তায় পাহাড়ে তিনি নিরাপদ আশ্রয় পেতেন এবং সেখান থেকেই অত্যাধুনিক ভারী অস্ত্র কেনাবেচা ও চোরাচালানের সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি; ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের একটি বাড়ির বাথরুমের ফলস ছাদে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় এক ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানের মাধ্যমে পুলিশ এই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীকে ৩টি পিস্তল ও গুলিসহ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।
মন্তব্য করুন