মাঝআকাশে ৩৬ হাজার ফুট উচ্চতায় ওড়ার সময় মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ভারতীয় বিমান সংস্থা এয়ার ইন্ডিয়ার একটি উড়োজাহাজের তিনটি হাইড্রোলিক ব্যবস্থা (গ্রিন, ব্লু ও ইয়েলো) একযোগে বিকল হয়ে পড়েছিল। এর ফলে সৃষ্ট তীব্র ঝাঁকুনিতে বিমানের ছাদ ও লাগেজের তাকে ছিটকে পড়ে ৪ জন ক্রুসহ মোট ২৪ জন আরোহী আহত হন। ভারতের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত সংস্থা এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB)-এর প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ ও বিরল দুর্ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, এয়ারবাস এ৩২০নিও মডেলের কোনো বিমানে একসঙ্গে তিনটি হাইড্রোলিক সিস্টেম বিকল হয়ে যাওয়ার ঘটনা অত্যন্ত নজিরবিহীন।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৪ আগস্ট ফুকেট থেকে নয়াদিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার ‘এআই ২৩৭৯’ (AI 2379) ফ্লাইটটিতে ১৩৭ জন যাত্রী ও ৮ জন ক্রুসহ মোট ১৪৫ জন আরোহী ছিলেন। ২০১৮ সালে তৈরি এয়ারবাস বিমানটি যখন মাঝআকাশে নিখুঁতভাবে উড়ছিল, ঠিক তখনই হঠাৎ এর তিনটি হাইড্রোলিক সার্কিটই চাপ হারিয়ে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। হাইড্রোলিক ব্যবস্থা বিকল হওয়ার সাথে সাথেই বিমানের অটোপাইলট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ককপিটে ‘স্টল ওয়ার্নিং’ বা বিমান নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিপদসংকেত বেজে ওঠে। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের এই বিশৃঙ্খলায় বিমানটি প্রথমে তার নির্ধারিত উচ্চতা থেকে ৩৭২ ফুট ওপরে উঠে যায় এবং এর পরপরই আচমকা ২৯২ ফুট নিচে নেমে আসে। ঘটনার সময় কেবিনে ‘সিট-বেল্ট’ বাঁধার সংকেত বন্ধ থাকায় অনেক যাত্রী ও কেবিন ক্রু নিজেদের আসনে সুরক্ষিত ছিলেন না। ফলে তীব্র ও আকস্মিক ঝাঁকুনিতে তারা ছিটকে গিয়ে বিমানের ভেতরের প্যানেল ও ছাদের সাথে ধাক্কা খান, যার ফলে ২৪ জন আহত হন এবং ৪ জনের আঘাত ছিল বেশ গুরুতর।
বিপজ্জনক এই পরিস্থিতিতে প্রথমে কো-পাইলট এবং পরবর্তীতে প্রধান পাইলট (ক্যাপ্টেন) ম্যানুয়ালি বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। সৌভাগ্যবশত, কয়েক সেকেন্ডের চরম উত্তেজনার পর বিমানের হাইড্রোলিক ব্যবস্থা আবার স্বয়ংক্রিয়ভাবে সচল হয় এবং পাইলটরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিমানটিকে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করাতে সক্ষম হন। তবে বিমানটি অবতরণের পর এক নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক মেডিকেল পরীক্ষায় বিমানের প্রধান পাইলটের শরীরে সাইকো-অ্যাক্টিভ বা মাদক জাতীয় উপাদানের উপস্থিতি (নন-নেগেটিভ ফলাফল) পাওয়া গেছে। AAIB এই গুরুতর বিষয়টির ওপর জোর দিয়ে ভারতের বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা (DGCA)-কে উক্ত পাইলটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। একই সাথে কীভাবে একটি আধুনিক বিমানের তিনটি ব্যাকআপ হাইড্রোলিক সিস্টেম একসাথে বিকল হলো, তা জানতে গভীর কারিগরি অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে।
মন্তব্য করুন