বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলমান তৃতীয় অধিবেশনে সরকার ও বিরোধী দলের তীব্র মতবিরোধের জেরে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক উত্তাপ তৈরি হয়েছে। গত ২৭ আগস্ট ২০২৬ (বৃহস্পতিবার) রাতে স্পিকারের আসন অলঙ্কৃত করা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশন চলাকালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-সহ ১১ দলীয় বিরোধী জোটের সকল সংসদ সদস্য সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন। রাত আনুমানিক ৮:০৭ মিনিটে বিরোধী দলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান স্পিকারের অনুমতি নিয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সরকারের একতরফা নীতি ও সংসদীয় কর্তৃত্ববাদের তীব্র সমালোচনা করে জোটসহ সংসদ কক্ষ ত্যাগ করেন।
খণ্ডিত সংস্কার ও আইনি প্রক্রিয়ার বিরোধিতা
বিরোধী দলের সংসদ বর্জনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সরকারের পক্ষ থেকে আনা “খণ্ডিত বা আংশিক সংস্কার” (Piecemeal Reforms) নীতি। বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে গণভোটের রায় ও ‘জুলাই সনদের’ আলোকে যে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সূচনা হয়েছিল, বর্তমান সরকার তা পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন না করে আংশিকভাবে করছে। বিশেষ করে, অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশের মধ্যে ১৬টি অধ্যাদেশকে আইনি সময়সীমার মধ্যে বিলে রূপান্তর না করে সেগুলোকে অকার্যকর বা তামাদি হতে দেওয়া হয়েছে। বিরোধী দল দাবি করেছিল যে, এই সংস্কার অধ্যাদেশগুলোকে আলাদা বা খণ্ডিতভাবে সংসদে না এনে জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সম্মিলিত উপায়ে এবং একটি ‘সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল’ গঠনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হোক।
বিতর্কিত তিনটি বিল ও কার্যপ্রণালী বিধি নিয়ে আপত্তি
সংসদে আইন প্রণয়ন কার্যাবলির ঠিক আগমুহূর্তে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপনকে কেন্দ্র করে এই বিরোধ চূড়ান্ত রূপ নেয়। বিল তিনটি হলো: জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ এবং শতাব্দী প্রাচীন আইন সংশোধনের লক্ষ্যে আনা সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬। বিরোধী দল প্রথমত আপত্তি তোলে যে, বৃহস্পতিবারের দিনটি সংসদীয় প্রথা অনুযায়ী বেসরকারি সদস্যদের (Private Members’ Business) জন্য নির্ধারিত থাকে, যেখানে मंत्रियों কর্তৃক সরকারি বিল টেবিল করা নিয়মবহির্ভূত। দ্বিতীয়ত, মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিলের খসড়া নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার গুমের ঘটনা তদন্তে মানবাধিকার কমিশনকে যে বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছিল, প্রস্তাবিত নতুন বিলে তা বাদ দিয়ে পুনরায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর তদন্তের দায়িত্ব ন্যস্ত করার তীব্র বিরোধিতা করে বিরোধী দল একে জনগণের সাথে এক ধরনের “বিশ্বাসঘাতকতা” হিসেবে আখ্যা দেয়।
সংসদীয় কর্তৃত্ববাদ ও জনগণের সংকট উপেক্ষা
বিরোধী দলের চিফ হুইপ এবং এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি “সংসদীয় স্বৈরতন্ত্র বা কর্তৃত্ববাদ” (Parliamentary Authoritarianism) চালাবার অভিযোগ তোলেন। বিরোধী দলের দাবি, সরকার তাদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিরোধী মতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এবং কোনো ধরনের সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে বিস্তারিত যাচাই-বাছাই ছাড়াই একক সিদ্ধান্তে সংসদ পরিচালনা করছে। এছাড়াও, দেশে চলমান তীব্র বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, লাগামহীন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি নিয়ে আলোচনার জন্য বিরোধী দল থেকে চারটি জরুরি নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং একটি বিশেষ সংসদ অধিবেশন ডাকার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু স্পিকার ও সরকারের পক্ষ থেকে জনগুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার কোনো ইতিবাচক সুযোগ না দেওয়ায় বিরোধী দল ক্ষুব্ধ হয়ে সংসদ বর্জন করে।
সরকারের প্রতিক্রিয়া ও অবস্থান
বিরোধী দলের এই আকস্মিক ওয়াকআউটের পর সংসদে সরকারি দলের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলের এই পদক্ষেপকে সুপরিকল্পিত এবং “আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা না করার মানসিকতা” হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি যুক্তি দেখান যে, অন্তর্বর্তী সরকারের মানবাধিকার ও গুম সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো তাড়াহুড়ো করে তৈরি করায় বেশ কিছু আইনি ত্রুটি ছিল। বর্তমান সরকার দেশি-বিদেশি অংশীজন এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখেই এই বিলগুলো সংসদে এনেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, তুচ্ছ অজুহাতে সংসদ বর্জন করার এই সংস্কৃতি গণতান্ত্রিক ধারাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং তিনি বিরোধী দলকে সংসদীয় বিতর্কে ফিরে এসে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
সংসদে এই তীব্র বাদানুবাদ এবং ওয়াকআউটের ঘটনাটি বর্তমান ত্রয়োদশ সংসদের সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যকার গভীর রাজনৈতিক অনাস্থা এবং সংস্কার প্রক্রিয়ার গতিপথ নিয়ে তৈরি হওয়া নতুন মেরুকরণকেই স্পষ্ট করে তুলেছে।
মন্তব্য করুন