
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত দুই মাস ধরে ব্যাপক পটপরিবর্তন লক্ষ করা গেছে। গত ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের আকস্মিক পদত্যাগের পর, দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দেশে প্রথমবার ব্যালটের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদে অনুষ্ঠিত সেই ভোটে জয়লাভ করে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল ২১ আগস্ট (শুক্রবার) সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের দরবার হলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছেন।
এই নতুন সূচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ৫ দশকেরও বেশি সময়ের ইতিহাসে মোট পালন করলেন। এই সুদীর্ঘ সময়ে দায়িত্ব পালন করা রাষ্ট্রপ্রধানদের মধ্যে বর্তমানে মাত্র দুজন সাবেক রাষ্ট্রপতি জীবিত আছেন।
জীবিত সাবেক ও বর্তমান রাষ্ট্রপতিরা কে কেমন ও কোথায় আছেন?
১. মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বর্তমান রাষ্ট্রপতি):
সংসদের মোট ৩৪৯টি আসনের মধ্যে ২৫৫টি ভোট পেয়ে তিনি বিপুল ব্যবধানে জয়ী হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী, জামায়াত সমর্থিত জোটের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পান ৮৮টি ভোট। গতকাল ২১ আগস্ট ২০২৬ (শুক্রবার) রাতে জাতীয় সংসদের অ্যাক্টিং স্পিকার কায়সার কামাল তাঁকে শপথ বাক্য পাঠ করান। এই শপথের মধ্য দিয়ে তিনি বর্তমানে রাষ্ট্রপ্রধানের সরকারি বাসভবন ও কার্যালয় বঙ্গভবনে তাঁর ৫ বছরের কার্যকাল শুরু করেছেন। শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
২. মো. সাহাবুদ্দিন (সাবেক রাষ্ট্রপতি):
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। তবে তাঁর ৫ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার ২ বছর আগেই, গত ২৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে তিনি পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্রে তিনি গুরুতর স্বাস্থ্যগত কারণ ও ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ (যার ফলে সাময়িকভাবে জ্ঞান হারানোর মতো সমস্যা হয়) রোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করেন। বর্তমানে ৭৬ বছর বয়সী এই সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান সম্পূর্ণ নিভৃতে তাঁর পরিবারের সাথে এবং চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে শারীরিক চিকিৎসারত অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
৩. মো. আবদুল হামিদ (সাবেক রাষ্ট্রপতি):
বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসের একমাত্র রাষ্ট্রপতি, যিনি একটানা দুই মেয়াদে দীর্ঘ ১০ বছর (২০১৩-২০২৩) সফলভাবে বঙ্গভবন পরিচালনা করেছেন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির পদ থেকে স্বাভাবিক অবসরে যাওয়ার পর তিনি রাজধানীর নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকায় তাঁর নিজস্ব বাসভবনে বসবাস করছেন। বর্তমানে প্রবীণ এই সাবেক রাজনীতিবিদের বয়স ৮২ বছর। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি বর্তমানে কিছুটা অসুস্থ ও চিকিৎসাধীন আছেন এবং পরিবারের সান্নিধ্যে সময় পার করছেন।
ঐতিহাসিক চালচিত্র: রাষ্ট্রপতি পদে কারা, কত দিন ও কীভাবে দায়িত্ব সামলেছেন?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিভিন্ন সময় সংসদীয় পদ্ধতি থেকে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা, আবার সামরিক শাসন থেকে সংসদীয় পদ্ধতিতে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। এই পালাবদলের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রপতিদের মেয়াদকালকে ৪টি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়:
১. স্বাধীনতার ঊষালগ্ন ও যুদ্ধকালীন চালচিত্র (১৯৭১ – ১৯৭৫)
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (প্রথম মেয়াদ): ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ থেকে ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ (৮ মাস ২৫ দিন)। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় তাঁর অনুপস্থিতিতে দেশ পরিচালিত হয়।
- সৈয়দ নজরুল ইসলাম (অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি): ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ (৯ মাস ১৫ দিন)। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি অত্যন্ত সফলভাবে মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন।
- বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী: ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ থেকে ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩ (১ বছর ১১ মাস ১২ দিন)। স্বাধীনতার পর দেশের সংসদীয় শাসন কাঠামো বিনির্মাণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
- মোহাম্মদউল্লাহ: ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩ থেকে ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ (১ বছর ১ মাস ১ দিন)। প্রথমে ভারপ্রাপ্ত এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান (দ্বিতীয় মেয়াদ): ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ থেকে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ (৬ মাস ২১ দিন)। চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা চালুর পর তিনি দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নেন এবং ১৫ আগস্ট সপরিবারে নিহত হন।
২. রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও সামরিক শাসন আমল (১৯৭৫ – ১৯৯০)
- খন্দকার মোশতাক আহমদ: ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ থেকে ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ (২ মাস ২২ দিন)। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখল করেন।
- বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম: ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ থেকে ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ (১ বছর ৫ মাস ১৫ দিন)। প্রধান বিচারপতি থেকে রাষ্ট্রপতি ও সিএমএলএ হন।
- জিয়াউর রহমান: ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ থেকে ৩০ মে ১৯৮১ (৪ বছর ১ মাস ৯ দিন)। ১৯৭৮ সালে দেশের প্রথম সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হন, ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন।
- বিচারপতি আব্দুস সাত্তার: প্রথমে ৩০ মে ১৯৮১ থেকে ২০ নভেম্বর ১৯৮১ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত হয়ে ২৪ মার্চ ১৯৮২ পর্যন্ত (মোট ১০ মাস) দায়িত্ব পালন করেন। সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।
- বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরী: ২৭ মার্চ ১৯৮২ থেকে ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৩ (১ বছর ৮ মাস ১৩ দিন)। সামরিক জান্তা এরশাদ কর্তৃক প্রধান বিচারপতি থেকে রাষ্ট্রপতি পদে বসানো হয়।
- এইচ এম এরশাদ: ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ থেকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ (৬ বছর ১১ মাস ২৫ দিন)। দীর্ঘ সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসনের পর ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
৩. সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমল (১৯৯০ – ২০০৯)
- বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ (অস্থায়ী): ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ থেকে ৯ অক্টোবর ১৯৯১ (১০ মাস ৩ দিন)। প্রথম সর্বদলীয় নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে অবাধ নির্বাচন উপহার দেন।
- আব্দুর রহমান বিশ্বাস: ৯ অক্টোবর ১৯৯১ থেকে ৯ অক্টোবর ১৯৯৬ (৫ বছর)। সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে সফলভাবে ৫ বছর মেয়াদ পূর্ণ করেন।
- বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ (পূর্ণ মেয়াদ): ৯ অক্টোবর ১৯৯৬ থেকে ১৪ নভেম্বর ২০০১ (৫ বছর ১ মাস ৫ দিন)। দেশের ১২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে দ্বিতীয়বার বঙ্গভবনে আসেন।
- অধ্যাপক এ. কিউ. এম. বদ্রুদ্দোজা চৌধুরী: ১৪ নভেম্বর ২০০১ থেকে ২১ জুন ২০০২ (৭ মাস ৭ দিন)। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জেরে সাত মাসের মাথায় পদত্যাগ করেন।
- ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার (ভারপ্রাপ্ত): ২১ জুন ২০০২ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ (২ মাস ১৬ দিন)। স্পিকার হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে দায়িত্ব পালন করেন।
- অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ: ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ থেকে ১২ জানুয়ারি ২০০৯ (৬ বছর ৪ মাস ৬ দিন)। রাজনৈতিক তীব্র সংকটের মুখে ২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত একই সাথে রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন।
৪. আধুনিক আমল ও সাম্প্রতিক সংকট (২০০৯ – ২০২৬)
- মো. জিল্লুর রহমান: ১২ জানুয়ারি ২০০৯ থেকে ২০ মার্চ ২০১৩ (৪ বছর ২ মাস ৮ দিন)। দায়িত্ব পালনকালেই সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
- মো. আবদুল হামিদ: ২৪ এপ্রিল ২০১৩ থেকে ২৪ এপ্রিল ২০২৩ (১০ বছর)। বাংলাদেশের ইতিহাসে টানা দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একমাত্র ব্যক্তি।
- মো. সাহাবুদ্দিন: ২৪ এপ্রিল ২০২৩ থেকে ২৪ জুলাই ২০২৬ (৩ বছর ৩ মাস)। ২০২৬ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করেন।
- হাফিজ উদ্দিন আহমদ (ভারপ্রাপ্ত): ২৪ জুলাই ২০২৬ থেকে ২০ আগস্ট ২০২৬ (২৭ দিন)। মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে তিনি অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
- মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (বর্তমান): ২১ আগস্ট ২০২৬ থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০ আগস্ট সংসদের বিশেষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে তিনি দায়িত্ব নেন।
(ঐতিহাসিক তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন ও সংসদ সচিবালয় আর্কাইভ)।