রাজধানী ঢাকার চিরচেনা ও তীব্র যানজট নিরসনে আড়াই লাখ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় ধরে নতুন করে আরও তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই মেগা উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও, সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মনে এখন একটাই প্রধান প্রশ্ন—বিপুল পরিমাণ খরচের এই মেট্রোরেলের ভাড়া শেষ পর্যন্ত কত দাঁড়াবে? বর্তমানে চালু থাকা উত্তরা-মতিঝিল (এমআরটি লাইন-৬) রুটে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৫ টাকা, যেখানে সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা এবং শুরু থেকে শেষ স্টেশন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ভাড়া ৯০ টাকা (কমলাপুর পর্যন্ত বর্ধিত অংশে ১০০ টাকা) নির্ধারিত আছে। তবে নতুন প্রকল্পগুলোর আকাশচুম্বী নির্মাণ ব্যয়, ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের বিশাল চাপের কারণে ভবিষ্যতে মেট্রোরেলের যাত্রী সাধারণের ওপর ভাড়ার একটি বড় ধরনের বোঝা চাপতে পারে বলে চরম আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন ও ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, পাতাল (Underground) ও উড়াল (Elevated) পথের সমন্বয়ে মোট ৬৪.৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নতুন ৩টি মেট্রোরেল প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত ৩১.২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘এমআরটি লাইন-১’ (দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ পাতাল রেল) এবং হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘এমআরটি লাইন-৫: নর্দার্ন রুট’—এই দুই মেগা প্রজেক্টের পেছনেই ব্যয় হবে প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা। এই বিশাল অঙ্কের খরচের সিংহভাগ, অর্থাৎ প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা আসছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে প্রকল্প ঋণ হিসেবে। এই ঋণ আগামী ৪০ বছরে বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট সুদের হারসহ পরিশোধ করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, মেট্রোরেলকে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী করতে এবং এই বিপুল পরিমাণ ঋণের কিস্তি তুলতে হলে ভবিষ্যৎ লাইনগুলোর ভাড়া বর্তমানের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায়, ঋণের বোঝা টানতে সরকারকে প্রতি বছর জাতীয় বাজেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে হবে, যা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে।
আর্থিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমানে সচল থাকা এমআরটি লাইন-৬ থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন লাখ যাত্রী যাতায়াত করেন, যার বিপরীতে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা টিকিট বিক্রির মাধ্যমে আয় হয়। তবে জাইকার কাছ থেকে নেওয়া ঋণের রেয়াতকাল (Grace Period) শেষ হওয়ায় চলতি ২০২৬ সাল থেকেই প্রতি বছর প্রায় ৪৬৫ কোটি টাকা করে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা ২০৩০ সাল নাগাদ বার্ষিক ৮০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। অর্থাৎ, বর্তমানের টিকিট বিক্রির পুরো আয় দিয়েও ঋণের কিস্তি সম্পূর্ণ পরিশোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়; এর ওপর রয়েছে দৈনিক বিদ্যুৎ বিল, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন এবং স্টেশনের বিশাল রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় (Operational Cost)। বর্তমান ভাড়া কাঠামোর একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, ঢাকার সাধারণ নন-এসি বাসের ভাড়া যেখানে প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪৫ পয়সা, সেখানে মেট্রোরেলের ভাড়া দ্বিগুণ (৫ টাকা)। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দিল্লি বা কলকাতার মেট্রোরেলের ভাড়ার চেয়েও বাংলাদেশের ভাড়া তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাতাল রেলের নির্মাণ ও পরিচালন ব্যয় উড়াল রেলের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি হয়। মাটির নিচে ২৪ ঘণ্টা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (AC) সচল রাখা, আলো ও অক্সিজেন সরবরাহের জন্য যে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ খরচ হবে, তা ভাড়ার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। ফলে নতুন পাতাল রেলের লাইনগুলো চালু হলে বর্তমানের ‘কিলোমিটার প্রতি ৫ টাকা’র ফমুর্লা বজায় রাখা সরকারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। একদিকে যানজটমুক্ত স্বস্তির ও দ্রুতগতির যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত হলেও, অপরিমিত নির্মাণ ব্যয়, ডলারের সংকট ও ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় এটি দূরভবিষ্যতে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য “স্বল্প ব্যয়ের” গণপরিবহন হিসেবে কতটুকু টিকিয়ে রাখা যাবে, তা নিয়ে বড় ধরনের নীতিগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে কর্তৃপক্ষ। সাধারণ জনগণের দাবি, মেগা প্রকল্পের ঋণের দায় যেন সাধারণ যাত্রীদের টিকিটের ওপর চাপিয়ে দিয়ে মেট্রোরেলকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া না হয়।
মন্তব্য করুন