নেপালে চীন সীমান্তের কাছে তুষারধসের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৭৫ জনে দাঁড়িয়েছে। অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে এখনো ৪০০ জনেরও বেশি বিদেশী পর্যটকসহ পাঁচ শতাধিক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উপদ্রুত এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে উদ্ধার অভিযান চালাতে চরম বেগ পেতে হচ্ছে উদ্ধারকারীদের।
তুষারধস ও বন্যার মূল উৎস
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নেপাল-চীন সীমান্তের তিব্বত অংশের একটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রথমে এক বিশাল তুষারধসের ঘটনা ঘটে। তুষারধসের ফলে নেমে আসা বরফ ও মাটির বিশাল ধ্বংসাবশেষ লহেন্দে নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহকে সম্পূর্ণ আটকে দেয়। এতে নদীর উজানে একটি কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে পানির চাপ সহ্য করতে না পেরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধটি ভেঙে যায় এবং কাদা-পানির এক বিশাল স্রোত তীব্র গতিতে নিচের দিকে নেমে আসে। এই উপচে পড়া পানি নেপালের ভোতেকোশি নদীতে এসে মিশলে নদীটি তার ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে। নেপালের উত্তর রাসুয়া, নুওয়াকোট এবং ধাদিং জেলা এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হতাহতের বর্তমান চিত্র ও নিখোঁজ পর্যটক
নেপাল পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিভিন্ন এলাকা থেকে এখন পর্যন্ত ১৭৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকৃত মরদেহের একটি বড় অংশ, অর্থাৎ ৯০ জনেরও বেশি মানুষের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে কেবল চিতওয়ান এবং পূর্ব নবলপরাসী জেলা থেকে। পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোত এসব মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে প্রশাসনের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিখোঁজ পর্যটকদের বিষয়টি। বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধসে পড়ায় বর্তমানে ৫৭৯ জন পর্যটকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। নিখোঁজদের এই তালিকায় ৪০০ জনেরও বেশি বিদেশি নাগরিক রয়েছেন, যারা মূলত ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হিমালয় অঞ্চলে ট্রেকিং ও ভ্রমণের জন্য এসেছিলেন।
অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
এই আকস্মিক বন্যা নেপালের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ অবকাঠামোকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। পাহাড়ি নদীর তীব্র পানির তোড়ে অন্তত ৯টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে নেপালের একটি বড় অংশে বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এছাড়া দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত অন্তত ১৯টি সংযোগ সেতু এবং প্রায় ৪০ কিলোমিটার মহাসড়ক পানির তোড়ে সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। রাস্তাঘাট ধসে পড়ায় এবং সেতু ভেঙে যাওয়ায় উপদ্রুত জেলাগুলোর বহু গ্রাম ও শহর নেপালের মূল ভূখণ্ড থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
উদ্ধার অভিযানের বর্তমান অবস্থা
যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণে উদ্ধারকারী দলগুলো সড়কপথে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পৌঁছাতে পারছে না। এই পরিস্থিতিতে নেপাল সেনাবাহিনী এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী বিশেষ হেলিকপ্টারের সাহায্যে উপদ্রুত এলাকায় উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ তৎপরতা চালাচ্ছে। আটকা পড়া দেশি-বিদেশি নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং নিখোঁজদের সন্ধানে ড্রোন ও বিশেষ উদ্ধারকারী দল ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বৈরী আবহাওয়া এবং নতুন করে ভূমিধসের আশঙ্কায় উদ্ধার কাজ বারবার ব্যাহত হচ্ছে।
মন্তব্য করুন