কুমিল্লায় মায়ের দামি আইফোনের লোভে ১৩ বছর বয়সী কিশোর ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে শ্বাসরোধ ও মাথায় আঘাত করে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে কিশোর গ্যাং চক্রের সদস্যরা। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রবিবার জোহরের নামাজ শেষে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকায় জানাজা সম্পন্ন করার পর পারিবারিক গোরস্থানে তাকে চিরশায়িত করা হয়। নিহত অপ্রতিম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম এবং মোবাইল অ্যাকসেসরিজ ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার দম্পতির একমাত্র সন্তান এবং স্থানীয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ঘটনার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোনটি নিয়ে সে নীল রঙের পাঞ্জাবি পরে বেশ আগ্রহের সাথে বাসা থেকে বের হয়। সন্ধ্যা সোয়া ছটা পর্যন্ত গন্ধমতি এলাকায় তার ফোনের লোকেশন পাওয়া গেলেও এরপর থেকে সেটি বন্ধ হয়ে যায় এবং সে আর বাড়ি ফিরে আসেনি। স্বজনরা সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও তার সন্ধান না পেয়ে শুক্রবার রাতেই অপ্রতিমের বাবা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকেরা রাতভর সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখতে পান, শুক্রবার বিকেল ৩টা ৭ মিনিটের দিকে কোটবাড়ি এলাকার রাস্তা দিয়ে অপ্রতিম তুহিন নামের এক কিশোরের সঙ্গে হেঁটে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার দিকে যাচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজের ওই স্ক্রিনশট স্থানীয় বাসিন্দাদের দেখালে তারা মোটরসাইকেল আরোহী তুহিনকে শনাক্ত করতে সাহায্য করে এবং অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই তুহিনকে এলাকায় আর দেখা যায়নি। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ১৯ সেপ্টেম্বর শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পেছনে সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত এবং রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সে সময় অপ্রতিমের মানিব্যাগটি ঘটনাস্থলে পড়ে থাকলেও মায়ের আইফোনটি নিখোঁজ ছিল। এই ঘটনার পর স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং থানা পুলিশের একাধিক দল প্রযুক্তির সহায়তায় যৌথ অভিযান পরিচালনা করে মূল পরিকল্পনাকারী তুহিনকে আটক করে। পরে তার দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী শনিবার দিবাগত রাতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সালমানপুর এলাকায় তুহিনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের মায়ের সেই আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অপরাধে তুহিনের পাশাপাশি আনাস ও ফাহিম আহমেদ নামের আরও দুই কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, লালমাই পাহাড়ের নির্জন টিলায় কিশোর গ্যাং চক্রের সদস্যরা আগে থেকেই ওঁত পেতে ছিল এবং অপ্রতিমকে একা পেয়ে মারধর ও শ্বাসরোধ করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে তার ফোন ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুটে নেয়। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে মা ড. নাহিদা বেগম বার বার মূর্ছা যাচ্ছেন এবং বিলাপ করে বলছেন, “তোরা আইফোন নিয়ে যেতি, কিন্তু আমার ছেলেকে খুন করলি কেন?” এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আজ ২০ সেপ্টেম্বর সাধারণ শোক দিবস ঘোষণা করে সকল ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত রেখেছে। পাশাপাশি, ঘাতকদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক ফাঁসির দাবিতে আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে তীব্র বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন।
মন্তব্য করুন