মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার ২১ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী একমাত্র ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (শনিবার) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস সংলগ্ন কোটবাড়ি এলাকার লালমাই পাহাড়ের দক্ষিণ সানন্দা অংশের একটি জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত অপ্রতীম স্থানীয় বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, শুধুমাত্র দামী আইফোনটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই কিশোরকে নির্মমভাবে মাথায় আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে, কারণ উদ্ধারের সময় তার কাছে থাকা মোবাইল ফোনটি পাওয়া যায়নি।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আগের দিন ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে অপ্রতীম মায়ের আইফোনটি সাথে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হয়। এরপর সন্ধ্যা নেমে গেলেও সে বাড়িতে ফিরে না আসায় পরিবার বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত প্রযুক্তির সহায়তায় তার ফোনের অবস্থান কুমিল্লার গন্ধমতী এলাকায় শনাক্ত করা গেলেও এর পরপরই ফোনটি বন্ধ হয়ে যায়। কোনো উপায় না পেয়ে অপ্রতীমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার ওই রাতেই কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন এবং তার মা ফেসবুকে ছেলেকে খুঁজে পেতে সবার সহযোগিতা চেয়ে আবেগঘন পোস্ট দেন। পরবর্তীতে শনিবার সকালে স্থানীয় এক ব্যক্তি বাঁশ কাটতে গিয়ে জঙ্গলে মাথায় গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত অবস্থায় অপ্রতীমের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়লে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ পুরো এলাকায় গভীর শোক ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান খান ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, “শুধুমাত্র একটি আইফোনের জন্য ছেলেটাকে মেরে ফেললি। এইরকম ১০টা ফোন মুক্তিপণ হিসেবে চাইতি—আমরা দিতাম।” এদিকে ঘটনাটি খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দল। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম জানান, সিসিটিভি ফুটেজ এবং তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত চলছে এবং মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের বিষয়টিই আপাতত হত্যার মূল কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া হচ্ছে। জেলা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ‘ক্লু’ পেয়েছে এবং সন্দেহভাজন হিসেবে তুহিন নামের এক যুবককে ইতিমধ্যে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় জনতা।
মন্তব্য করুন