নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় আঘাত হানা প্রলয়ংকরী আকস্মিক বন্যার চার সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও কাটেনি দুর্যোগের ক্ষত। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে হিমালয়কন্যা নেপালে এখনো প্রায় ৬ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকারী দলগুলোর তৎপরতার মাঝেও প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা থেকে উদ্ধার হচ্ছে লাশ। নেপাল পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় দেশজুড়ে এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৪৫১ জনে। নিখোঁজদের বিশাল সংখ্যার কারণে এই প্রাণহানি আরও অনেক বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে স্থানীয় প্রশাসন। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবিত কাউকেই উদ্ধারের আশা ফিকে হয়ে আসছে।
দুর্যোগে দেশটির উত্তর ও মধ্য নেপালের জেলাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছে চিতওয়ান জেলায়, যেখান থেকে এ পর্যন্ত ৩৬৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া রাসুয়ায় ২৩৬ জন, পূর্ব নাওয়ালপরাসিতে ২৩২ জন, পশ্চিম নাওয়ালপরাসিতে ২২২ জন এবং নুওয়াকোটে ২০৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। গোর্খায় ৭৯ জন ও ধাদিং জেলায় ৭২ জনের প্রাণহানির পাশাপাশি তানাহু জেলায় ৩৮ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কাঠমান্ডুর কেন্দ্রীয় হাসপাতালেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ২ জন মারা গেছেন। তবে উদ্ধার হওয়া ১,৪৫১টি মরদেহের মধ্যে মাত্র ১১০ জনের পরিচয় শনাক্ত করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ১,৩০০-র বেশি মরদেহ দীর্ঘ সময় পানিতে ভেসে থাকায় কিংবা কাদামাটির নিচে চাপা পড়ে থাকায় চেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যার ফলে ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া পরিচয় নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।
ভৌগোলিক দুর্গমতা এবং অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির কারণে বর্তমানে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভোতেকোশি নদীর তীব্র পাহাড়ি ঢলে শত শত ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও গুরুত্বপূর্ণ ঝুলন্ত সেতু ধসে পড়েছে, যার ফলে নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার বহু গ্রাম এখনো দেশের বাকি অংশ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এর পাশাপাশি নেপালের প্রধান অর্থনৈতিক খাত জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোও বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। পাহাড়ি ঢলের পলি ও কাদামাটি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর টানেলে ঢুকে পড়ায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। রাসুয়ার একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গ থেকেই ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ১৭টি লাশ উদ্ধার করতে হয়েছে। তবে এই চরম প্রতিকূলতার মাঝেও এ পর্যন্ত দেশজুড়ে ১৩,৭৮৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সমর্থ হয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। সরকারের পক্ষ থেকে এখন নিখোঁজদের সন্ধান, দুর্গম এলাকায় জরুরি ত্রাণ পৌঁছানো এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুত সচল করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
মন্তব্য করুন