মাঝ পদ্মায় একের পর এক ফেরি বিকল ও তীব্র স্রোতে ভেসে যাওয়ার ঘটনা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে পাটুরিয়া থেকে দৌলতদিয়া অভিমুখে ছেড়ে যাওয়া রো-রো ফেরি ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান’ মাঝনদীতে পৌঁছানোর পর আকস্মিকভাবে সেটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে। এ সময় নদীতে থাকা তীব্র স্রোতের তোড়ে ফেরিটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার ভাটিতে ভেসে যায়। প্রায় ৪ ঘণ্টা ধরে মাঝনদীতে আটকে থাকার পর অন্য একটি শক্তিশালী জাহাজের সহায়তায় ফেরিটিকে উদ্ধার করে ঘাটে আনা সম্ভব হলেও, এই দীর্ঘ সময়ে ফেরিতে থাকা শত শত যাত্রী ও যানবাহন চালকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও জীবননাশের শঙ্কা তৈরি হয়। একের পর এক এমন ঘটনা নৌপথের অব্যবস্থাপনা এবং ত্রুটিপূর্ণ কারিগরি নজরদারিকেই বারবার স্পষ্ট করে তুলছে।
এই নৌরুটের নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রীদের অভিযোগ, মাঝনদীতে ফেরি বিকল হওয়ার মতো জরুরি মুহূর্তে সাধারণ মানুষের সুরক্ষায় কর্তৃপক্ষের কোনো কার্যকর গাইডলাইন বা পূর্ব-প্রস্তুতি থাকে না। ফেরির ধারণক্ষমতার তুলনায় লাইফ জ্যাকেটের সংখ্যা যেমন সীমিত, তেমনি বিপদের সময় সেগুলো কোথায় রাখা থাকে বা কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে যাত্রীদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না। ভুক্তভোগীদের মতে, অনেক সময় পুরাতন ও নামমাত্র ফিটনেস থাকা ফেরি দিয়ে যাত্রী পারাপার করার কারণেই মাঝপদ্মায় ঘনঘন এমন যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে, যা যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
পদ্মার এই তীব্র স্রোত এবং ফেরি সংকটের প্রভাব কেবল দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পার্শ্ববর্তী রাজবাড়ীর ধাওয়াপাড়া ও পাবনার নাজিরগঞ্জ নৌরুটেও এর চরম প্রভাব পড়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে তীব্র স্রোতের কারণে এই রুটেও ফেরি চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই রুটের জন্য বরাদ্দ থাকা দুটি ফেরির মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরেই বিকল হয়ে পড়ে আছে। অন্য সচল ফেরিটি দিয়ে পারাপার সচল রাখার চেষ্টা করা হলেও নদীর তীব্র স্রোতে সেটির ইঞ্জিন অতিরিক্ত উত্তপ্ত (ওভারহিট) হয়ে বিকল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে সাময়িকভাবে ফেরি চলাচল স্থগিত রাখে। ফেরি বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ স্পিডবোট ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে নদী পার হচ্ছেন, যা নদী তীরের মানুষের নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকিতে ফেলছে।
অন্যদিকে, যাত্রী সাধারণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হলেও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্পোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) এবং উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো তাদের সক্ষমতার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছে। বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট শাখার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, এই রুটে বর্তমানে চলাচলকারী প্রতিটি ফেরিরই বৈধ সার্ভে ও ফিটনেস সনদ রয়েছে এবং এগুলো সম্পূর্ণ দক্ষ ও লাইসেন্সধারী নাবিকদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিস ও বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, যেকোনো বড় ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা মোকাবেলায় আরিচা, ফরিদপুর ও গোয়ালন্দ ঘাটে স্পিডবোটসহ ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ ডুবুরি দল সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত রয়েছে। তবে সাধারণ যাত্রী ও বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল দুর্ঘটনা-পরবর্তী উদ্ধার প্রস্তুতির ওপর নির্ভর না করে, ফেরিগুলোর নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা এবং মাঝনদীতে যাত্রীদের তাৎক্ষণিক জীবনরক্ষাকারী সরঞ্জামের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করাই এই মুহূর্তে নৌপথের মূল দাবি।
মন্তব্য করুন