বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার এখন তীব্র ভাঙনের মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী ও সি-গাল পয়েন্টসহ প্রায় ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সাগরের তীব্র ঢেউ ও জোয়ারের পানির তোড়ে প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে সৈকতের চিরচেনা বালুচর। কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ খাল ও বড় বড় গর্তের। পরিবেশবিদ এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব এবং অপরিকল্পিত মানবসৃষ্ট হস্তক্ষেপের কারণেই এই ভাঙন দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে এক মহা-পরিবেশগত সংকটের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সৈকত এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক ফুট উঁচুতে আছড়ে পড়ছে। ঢেউয়ের এই প্রচণ্ড আঘাতে সৈকতের সুরক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বালিয়াড়িগুলো ধসে যাচ্ছে। বালিয়াড়িতে জন্মানো সাগরলতা ও নিশিন্দার মতো প্রাকৃতির উদ্ভিদ, যা মাটির ক্ষয় রোধ করত, তা অতিরিক্ত পর্যটকদের যাতায়াত এবং যান্ত্রিক বাহন চলাচলের কারণে আগেই ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে ঢেউয়ের আঘাত সরাসরি সৈকতের মূল মাটিতে এসে লাগছে। এছাড়া ভাঙনের তীব্রতায় গত কয়েক বছরে সমুদ্রতীরের হাজার হাজার ঝাউগাছ শিকড়সহ উপড়ে সাগরে তলিয়ে গেছে, যা এই ক্ষয়কে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভাঙনের পেছনে প্রকৃতির চেয়ে মানুষের অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই বেশি দায়ী। কক্সবাজার সৈকতকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ECA) ঘোষণা করা হলেও আইন অমান্য করে প্লাবনভূমি ও সৈকতের কাছাকাছি একের পর এক বহুতল হোটেল-মোটেল এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। এসব পাকা কাঠামোর কারণে সাগরের ঢেউ প্রাকৃতিক উপায়ে বালি জমিয়ে সৈকত পুনর্গঠন করতে পারছে না। ভাঙন ঠেকাতে স্থানীয় প্রশাসন সাময়িকভাবে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ব্যবহার করলেও শক্তিশালী ঢেউয়ের মুখে তা স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারছে না। উল্টো অনেক জায়গায় ফেটে যাওয়া জিও ব্যাগের বালি ও প্লাস্টিকের অংশ সাগরের পানিতে মিশে পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে।
কক্সবাজারের এই বর্তমান পরিস্থিতি দেশের পর্যটন শিল্প এবং উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের জন্য এক বিরাট হুমকির সংকেত। বালিয়াড়ি ও প্রশস্ত বালুচর পুরোপুরি হারিয়ে গেলে পর্যটকরা তাদের আকর্ষণ হারাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। এছাড়া সমুদ্রের পানি ক্রমাগত ভেতরের দিকে চলে আসায় ভূগর্ভস্থ মিঠাপানির স্তরে নোনা পানি প্রবেশ করছে। এতে স্থানীয় এলাকায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে এবং কৃষিজমি উর্বরতা হারাচ্ছে। ভাঙন এভাবে অব্যাহত থাকলে সৈকতের কোল ঘেঁষে থাকা শত শত কোটি টাকার অবকাঠামো ও বিখ্যাত মেরিন ড্রাইভ সড়ক সাগরে বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে জিও ব্যাগের মতো সাময়িক ব্যবস্থা বন্ধ করে দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক গবেষণা, বালিয়াড়ি ও সাগরলতা পুনরুদ্ধার এবং কঠোরভাবে পরিবেশ আইন প্রয়োগের দাবি জানিয়েছেন।